মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার তাঁর আদর্শ ও মহান কর্মের দ্বারা মানুষের হ্নদয়ে বেঁচে আছেন অমর হয়ে

মো: শাহ আলম:
মানুষ অমরত্ব লাভ করে তার মহান কর্মের দ্বারা,নিষ্ঠার দ্বারা,নির্লস কৃচ্ছ্ সাধনার দ্বারা। জ্ঞান ও কর্মের সংযোগে অভিনব আদর্শ সৃজনকারী এমনি একজন মানুষ সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার মরহুম মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার।

মরহুম রওশন আলী খোন্দকার ২ ফেব্রুয়ারি ১৯০২ সালে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার শাহরিয়ার পুর ( বারইগাতী) গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন ওলি মাহমুদ খোন্দকার।তিনি একজন প্রখ্যাত আলেম ও পীর ছিলেন।তাঁর অসংখ্য মুরীদান ছিল।এ অঞ্চলের বয়ষ্ক মুরব্বীদের মুখে এখনও তাঁর কথা শুনা যায়। মরহুম ওলি মাহমুদ খোন্দকারের বাবা হাজী আলী আহমেদ খোন্দকার ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও ধর্ম প্রচারক।।তাদের পূর্ব পুরুষদের নিবাস ছিল ভারতের মুর্শিদাবাদে।তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে বর্তমান সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় আসেন বলে জানা যায়।

মরহুম রওশন আলী খোন্দকার ছোট বেলা থেকেই তুখোড় মেধাবী ছিলেন। তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে সিরাজগঞ্জ বিএল স্কুল থেকে ১৯১৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯২১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১ম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন।তিনি ভারতের হুগলি থেকে বি.এ পাশ ও টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে বি. টি পাশ করেন বলে জানা যায়।এছাড়া তিনি সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ভারতের আলীগড় মাদ্রাসা থেকে আরবী সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি করে ধর্মীয় শিক্ষায় জ্ঞান অর্জন করেন।

মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার সাহেবের অন্যতম বাল্য বন্ধু ছিলেন মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ।তাঁরা এক সঙ্গে লেখাপড়া করেছেন দীর্ঘ দিন।এছাড়া মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সঙ্গেও তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায়। লেখাপড়া শেষে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ রাজনীতি ও রওশন আলী খোন্দকার শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

কর্ম জীবনে মরহুম মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার প্রথমে নিজ মেধা ও দক্ষতায় বৃটিশ সরকারের বিচার বিভাগে যোগদান করে কয়েক বছর চাকরি করেন।কিন্তু বৃটিশ সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায় ভাবে রায় দেওয়ার কারণে চাকরি ইস্তফা দেন।

এরপর মরহুম রওশন আলী খোন্দকার জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান বিতরণকে জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমার অবহেলিত মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য এগিয়ে আসেন।কাজীপুরের মেঘাই ইউসুফ উদ্দিন ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ( পরিবর্তীত নাম) যোগ্য প্রধান শিক্ষকের অভাবে বিদ্যালয়টির অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।তখন ঐ সময়কার বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি তাঁকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান।সেই আমন্ত্রণে সারা দিয়ে সেখানে তিনি কিছু দিন চাকরি করেন।তারপর চলে আসেন সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের চৌবাড়ী ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে।সে স্কুলে তিনি কয়েক বছর চাকরি করেন। কাজীপুরের মেঘাই উচ্চ বিদ্যালয় ও কামারখন্দের চৌবাড়ী ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যলয়ে তথ্য সংরক্ষণ না থাকায় তিনি কত সাল থেকে কত সাল পর্যন্ত চাকরি করেছেন তার তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।এছাড়া তিনি উল্লেখিত বিদ্যালয় গুলো ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চাকরি করেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে তাঁর কোনো তথ্য সংরক্ষণ নেই বলে নাম প্রকাশ করা সম্ভব হলো না।

মরহুম রওশন রওশন আলী খোন্দকার পিতৃভূমি তমসাচ্ছন্ন সলঙ্গা অঞ্চলে জ্ঞানের আলো বিতরণের জন্য ০১/০১/১৯৪৪ সালে সলঙ্গা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় স্কুলটি দশম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হয়ে ১৯৪৭ সালেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি প্রাপ্ত হয়।তাঁর অনুপ্ররণা ও উৎসাহে শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি ছিলেন একজন সফল প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। আদর্শবান, জ্ঞানী ও দক্ষ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা বঞ্চিত এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।সুশৃঙ্খলভাবে সলঙ্গা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালিত হতে থাকে।এমনি সময় ০১/০৯/১৯৫৩ সালে তিনি চাকরি ইস্তফা দিয়ে সিরাজগঞ্জ হাজী আহমেদ আলী (মুসলিম) উচ্চ বিদ্যালয়ে ( বর্তমান- হাজী আহমেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়) প্রধাণ শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। এই বিদ্যালয়ে তিনি 0৩/৯/১৯৫৩ থেকে ০১/০৭/১৯৫৯ সাল পর্যন্ত চাকরি করেন।কিন্তু মাঝ খানে সলঙ্গা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ জন ভারপ্রাপ্ত ও একজন প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করলেও তাঁরা বেশি দিন থাকেন নাই।এতে স্কুলের অবস্থা খারাপের দিকে গেলে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকগণ প্রতিষ্ঠাতা দরদী প্রধান শিক্ষক মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি পুনরায় ০২/০৯/১৯৫৯ সালে ফিরে আসেন।তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় স্কুল আবার তার পূর্বের গৌরব ফিরে পায়।

একজন আদর্শ শিক্ষকের সব গুলো গুণাবলী মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার সাহেবের মধ্যে ছিল। তিনি ছিলেন অসাধারণ চরিত্রের একজন মানুষ।নম্র,ভদ্র
ও সদা হাস্যোজ্জ্বল ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট।নেতৃত্ব দানে ছিলেন অনেক পটু।তাই তিনি ছিলেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সবার প্রিয়।মানুষকে আলোকিত করার মহান কারিগর রওশন আলী খোন্দকার সাহেব ৩১/০৭/১৯৬৬ সালে মহান শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসরে যান।

রওশন আলী খোন্দকার সাহেব সলঙ্গা অঞ্চলের আর্থ- সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।তাঁর সমস্ত জীবনের কর্মকান্ড ছিল শিক্ষা কেন্দ্রীক।অবসরের পরে তিনি তাঁর স্ব- উদ্যোগে নিজের গ্রামে ৫৮ শতাংশ জমি দান করে প্রতিষ্ঠা করেন শাহরিয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া তিনি নিজের এলাকার মৃত মানুষদের কবরস্থ করার জন্য ১ একর ৭৬ শতাংশ জমি দান করেছেন আঙ্গারু গ্রামের কবর স্থানে।

মরহুম রওশন আলী খোন্দকার একজন ব্যবসায়ী হিসেবে সফল ছিলেন।তিনি সিরাজগঞ্জ শহরে পঞ্চশের দশকে গড়ে তুলেছিলেন রওশন আর্ট প্রেস,রওশন বুক ডিপো, রওশন মেডিক্যাল হল।সততার সঙ্গে তিনি এ সকল ব্যবসা পরিচালনা করেছেন।তিনি তাঁর সততার গুণে অল্প দিনের মধ্যে তাঁর ব্যবসায় সফলতা বয়ে আনে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রারম্ভে রওশন আলী খোন্দকার সাহেবের অনুপ্রেরণায় তাঁর মেঝ ছেলে কে.এম. মশিউর রহমান ( লাবু),কনিষ্ঠ পুত্র কে.এম. মুশফিকুর রহমান ( আরজু মাস্টার) ও নাতি রাফিউল আলম খান রুমি(সাবেক প্যানেল মেয়র,সিরাজগঞ্জ পৌরসভা) মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সর্ব প্রথম সিরাজগঞ্জে রওশন আলী খোন্দকার সাহেবের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাটসহ আগুন জ্বালিয়ে দেয়।ফলে তাঁর জীবনে অর্জিত মহামূল্যবান দলিল পত্রাদিসহ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ পুড়ে যায়।তাই তাঁর জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

বিশিষ্ট শিক্ষা অনুরাগী মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার সাহেব ছিলেন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ। তাঁর মধ্যে ছিল জ্ঞান,দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা।তৎকালীন সমযে সিরাজগঞ্জ মহকুমার অনেক মানুষ নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার জন্য তাঁর পরামর্শ চাইলে তিনি বিনয়ের সাথে তাদের সুপরামর্শ ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে দিতেন।যাতে এ অঞ্চলের মানুষ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারে।

নিরহংকারী রওশন আলী খোন্দকার ছিলেন একজন ধর্মভীরু ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ।তিনি সর্বদা ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করেছেন বলে জানা যায়। তিনি জীবনে দুইবার হজ্জব্রত পালন করেন।ক্ষণজন্মা এই মৌলভী রওশন আলী খোন্দকার ১৯৭৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর গ্রামের নিজ বাড়িতে মহান আল্লাহ তায়ালার ডাকে সারা দিয়ে স্বীয় রবের সান্নিধ্যে চলে যান। তিনি চলে গেলেও তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের হ্নদয়ে অমর হয়ে আছেন।

লেখক:
মোঃ শাহ আলম
শিক্ষক, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক
সলঙ্গা প্রেসক্লাব

পুরাতন বার্তা…

শুক্র শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
© All rights reserved | Jamunar Barta

Desing & Developed BY লিমন কবির